ব্লগাররের নিজস্ব কন্ঠস্বর ও ভঙ্গি

ব্লগাররের নিজস্ব কন্ঠস্বর ও ভঙ্গিঅনেক দিন ব্লগিং এর বেপারে কথা বলা হয় না। আমি বেশ কিছু দিন আগে টিউটোরিয়ালবিডিতে ব্লগিং বিভাগ খুলে বেশ কিছু পোষ্টে ওয়েবে লেখালেখির বেপারে আলোচনা করেছি। আজ মূলতঃ লেখকের নিজস্বতার উপরে কথা বলবো। আমি বেশ কিছু কবি ও লেখকের লেখা ধারাবাহিকভাবে পড়েছি। আর ধারাবাহিকভাবে নিয়মিত কোন একজন লেখকের লেখা পড়লে আপনিও পরিবর্তনের ধারাটি বুঝতে পারবেন।

১.

জীবনান্দ দাসের কবিতাগুলো আমি নিয়মিত পড়েছি। তার প্রথম দিকের কবিতাগুলোতে নজরুল বা রবিন্দ্র নাথের ধারার মতোই মনে হয়েছিল। ছন্দের ক্ষেত্রে সচেতনতা বেশ বেশি ছিল এবং শব্দ বাছাইয়ে তেমন গুরুত্ব ছিলনা-এমনটাই দেখেছি।

জীবনানন্দ দাস অনেক বেশি লিখতেন এবং এর অনেক অনেক কবিতাই নিজে অপ্রকাশিত রাখতেন। তিনি জানতেন যে, এই কবিতা প্রকাশ যোগ্য না। কিছু দিন লেখার পরেই তার নিজস্ব একটা বিষয়, ভাব ও ভাষা পছন্দের ভাষা এসে গেলে যা আন্যদের চেয়ে আলাদা। আর এটাই তাকে অন্যতম হিসেবে সবার কাছে উপস্থাপিত করে তুললো। তার কবিতায় প্রেম, প্রকৃতি ও নারী বিচিত্রভাবে ব্যবহৃত হচ্ছিল।

প্রথম দিকে ব্লগিং শুরু করলে অনেকে বেশ কয়েকভাবে প্রভাবিত হয়। মূলতঃ নিজস্বতা বজায় রেখে লেখার চেয়ে অনেকে নিজের জানা স্পেশাল জিনিসটিই শেয়ার করতে চায়।  অনেকে প্রথমদিকে অন্যের লেখা দেখে ও তাদের মতো করে লেখতে চায়। ওয়েব দুনিয়ার হাজার হাজার বিষয় থেকে কিছু বিষয় তাকে তারা করে। সে এর মধ্যের কয়েকটা বিষয়ে ভক্ত হয় এবং লেখার চেষ্টা করে। তবে একটা বিষয় আছে… আমি যা পছন্দ করি তার যোগ্যতা আমার মাঝে নাও থাকতে পারে। নিজে লিখতে গেলে সেই দিকগুলোই প্রথমে ধরা পরে। লেখার বৈশিষ্ট্য অনেককে যোগ্যতার অভাবের কারনে পাল্টাতে হয়।

২.

লেখার বিষয়ের সাথে ভাষাগত পার্থক্যও থাকে। ভাষা অনেকটা সংক্রমক। আমি দুষ্টামী করে একটা সময় কয়েকজন বন্ধুর সাথে কথা বলতাম, অনেকটা বাচ্চাদের মতো নেকিয়ে নেকিয়ে । কয়েকদিন পরে দেখলাম কয়েকজন বন্ধুও আমার সাথে নেকিয়ে কথা বলা শুরু করলো। একটা স্টাইল তৈরি হয়ে গেল কথার মধ্যে। আর ঠিক এরকম যে শুধু সাধারন মানুষের মধ্যেই হয় তা কিন্তু নয়। অনেক বড় বড় ব্যক্তিদের মধ্যেও আমি এই প্রবনতা লক্ষ করেছি। অনেক লেখক, কবি  সাহিত্যিকও অন্যের স্টাইল অনুসরণ করেছে।

ব্লগিং এর ক্ষেত্রে নিজস্বতা তৈরীর পেছনে এটি বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। তবে বেশিভাগ ক্ষেত্রেই আরকেধরনের বৈশিষ্ট্য তৈরী হতে দেখা যায়। শামসুর রাহমানের কিছু কবিতায় জীবনান্দের বিশাল প্রভাব দেখতে পেয়েছিলাম। ব্লগাররা অনেকেই নিজের প্রয়োজনে বা ভাল লাগার কারনে অনেকের লেখা পড়ে। একসময় কয়েকজনের পাঠক হয়ে যায় এবং তাদের লেখা নিয়মিতভাবে পড়ে। আর তাদের প্রভাব নিজেদের লেখায় পড়তেই পারে। তবে অনেক ভাল ব্লগারই  তাদের লেখার মাঝে সৃজনশীল এমন একটা ভাব আনতে সক্ষম হন যা অন্যের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। প্রযুক্তি ব্লগে অনেকসময় এটা করা সম্ভব নাও হতে পারে। কারন এখানে সাহিত্যকে নিয়মিতভাবেই হত্যা করা হয়।

৩.

টাকার জন্য লিখতে গেলে অনেক সময় নিজস্বতা রক্ষা করে চলা সম্ভব নাও হতে পারে। অনেক সময় পাঠকের চাহিদা নিজের অভিজ্ঞতা আর সৃজনশীলতার উপরে হুমকি হতে পারে। টাকা আয়ের অনেক পথ আছে, এর মধ্যে লেখালেখি করে টাকা আয়ের পথটা একটু জটিল-ই। ওয়েবে আয়ের বেপারে যারা ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছেন তাদের মধ্যে লেখকদের আয় খুব বেশি না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পন্য বিক্রেতা, ওয়েব এপ্লিকেশন ডেভলপার, উদ্যোক্তা বা ইনভেষ্টর বেশি। আর তাই লেখার নিজস্বতাকে হারিয়ে লেখালেখিকে করলে তাদেরকে লেখক বলতে একটু কষ্টই হয়। ব্লগিং এ নিজের একটি ধারা তৈরী করতে অনেক সময় লেগে যেতে পারে, তবে সেই নিজের ধরনকে ভালবাসতে পারলে এবং দিন দিন উন্নত হলে বিশেষ ধরনের পাঠক গোষ্ঠি তৈরী হয়ে যাবে যা আপনাকে সবার চেয়ে আলাদারূপে প্রকাশ করতে পারে। লিউ বাবাতুয়ার লেখার মধ্যে এমনটিই দেখেছি।

একজন কর্কশ কন্ঠস্বরের লোক সারাজীবন চেষ্টা করেও কি ভাল গায়ক হতে পারবে? মাইকেল মধুসুদন দত্ত নিজেকে ইংরেজী সাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল। নিজস্বতা ত্যাগ করে সে তার মধ্যের কবিত্বকেই হত্যা করেছে। আর সেটা পরে বুঝতে পেরেছে। আর তাই এতদিন পরেও বাংলা ব্লগিংকে ত্যাগ করতে পারি নি…

আরও পড়ুনঃ

সৃষ্টিশীলতা বনাম উৎপাদনশীলতা

শব্দ- কথা, ভাব ও ভাষাঃ ব্লগিং এর সাথে যোগ সূত্র

ব্লগে শব্দের ও ভাষাগত সচেতনতা

ভাল ব্লগারগণ বেশ কিছু বিষয় অনুসরণ করে থাকেন

2 thoughts on “ব্লগাররের নিজস্ব কন্ঠস্বর ও ভঙ্গি”

  1. আপনার মত দুই একজন টেকি ব্লগার না থাকলে কি চলে বলুন? বাংলা ভাষায় মানসম্পন্ন টেকি ব্লগার খুব কম দুই একজন ছিলেন কিন্তু তারা হয় ইংরেজিতে চলে গেছেন কিংবা সময় করে উঠতে পারেন না।
    আরও একটা বড় ব্যাপার হল মানুষ দেখি সফটওয়্যার রিলিভেই ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু ইংরেজিতে লিখলে মান সম্পন্ন পাঠক অন্তত পাওয়া যায়।

  2. একদম শেষ অংশে যেটা লিখলেন সেটা আজকাল অধিকাংশ নতুন ব্লগারই করতে চান, তারা লিখেন টাকার জন্য নয়তো সার্চ ইঞ্জিনের জন্য, কিন্তু পাঠকের কথা একটুও ভাবেন না, অথচ লেখা কিন্তু পাঠকই পড়বে, ভালো মন্দ পাঠকই বুঝবে, সার্চ ইঞ্জন বা টাকা না, সবার উচিৎ পাঠকের জন্য লেখা, এতে টাকার পরিমাণ হয়তোবা তুলনামূলক কম হতে পারে, কিন্তু এতে পাঠকের যে ভালোবাসা পাওয়া যাবে তার মূল্য অনেক…

Comments are closed.